নিয়তির লেখা
কদিন ধরে কি যেন হয়েছে প্রিয়ন্তির কিছুই ভালো লাগে না। কি যেন ভাবে সবসময় একা একা।সবার মাঝে থেকেও নেই।মনটা তার হঠাৎ করেই অস্থির হয়ে উঠে।চোখ হঠাৎ চিকচিক করে উঠে কোন কারণ ছাড়াই।ছাদে দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবছিলো প্রিয়ন্তি পাশে ছোট বোন প্রিয়া কখন এসে দাঁড়িয়ে ছিলো লক্ষ্যই করেনি।
-এখানে একা দাঁড়িয়ে কি করিস আপু?
-কিছু না রুমে দম বন্ধ হয়ে আসছিলো।
-হুম বুঝি বুঝি সবই বুঝি।ভাইয়ার কথা মনে পরছে?
-তুই একটু বেশি পেকে গেছিস।পড়া নেই তোর?যা এখান থেকে।
প্রিয়া কথা না বারিয়ে চলে এলো সেখান থেকে।প্রিয়ন্তির চোখ ভরে এলো কান্নায়।তিন মাস আগে তার বিয়ে হয়।পাতলা গড়ন পানপাতা চেহারা বেশ সুন্দর দেখতে।চুপচাপ স্ববভাব।অনার্স থার্ড ইয়ার এর ফাইনাল পরীক্ষা সামনে।বিয়ের জন্য প্রস্তাব আসলে পাত্তা দিতো না সে।কিন্তু এবার তার মা তাকে পেয়ে বসেছে ভালো একটা প্রস্তাব এসেছে ছেলে আর্মির ক্যাপ্টেন।কোন কিছুই শুনলো না তার মা।শাড়ি হাতে দিয়ে বললো তৈরী হয়ে নে তোকে দেখতে আসবে ছেলের পরিবারের লোক।অনিচ্ছা সত্বেও শাড়ি পড়লো প্রিয়ন্তি অসম্ভব সুন্দর লাগছিলো তাকে।কারও সামনে শাড়ি পরে সেজেগুজে বসে থাকতে হবে ভাবতেই তার গা রি রি করে উঠলো।বিকালে ছেলের মা,বড় বোন,ছেলে,ছেলের দুলাভাই এলো তাকে দেখতে।তাদের সামনে বসে আছে প্রিয়ন্তি এক এক প্রশ্ন করছিলো তারা সে শুধু মাথা নিচু করে উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল। প্রশ্ন উত্তর পর্ব শেষ করে ছেলের সাথে আলাদা কথা বলার পর্বও বাকি রইলো না।ইফতির সাথে কথা বলার সময় দু'বার তাকিয়ে ছিলো তার দিকে।প্রথম দেখেই প্রেমে পড়ে যাবার মতো চেহারা তার।যাই হোক পছন্দ হয়েছে ইফতিকে।যদিও বা তেমন কথা বলেনি।আসলে কি বলবে বুঝতে পারছিলো না সে।নিরবতা ভেঙ্গে ইফতি বললো
-আপনার চোখগুলো দারুন মায়াবী জানেন আপনি?
আপনার নামটাও সুন্দর
প্রিয়ন্তি কিছু বলেনি চুপ করে শুনছিলো।লজ্জা করছিলো তার।
ইফতি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললো
-ঠিক আছে আপনাকে কিছু বলতে হবে না।চলুন উঠি।
তারা চলে যাবার পর প্রিয়ন্তি তার রুমে গিয়ে আয়নায় সামনে দাঁরিয়ে মনে মনে ভাবছিল সত্যিই চোখ দুটো মায়াবী?পরদিন ইফতির মা কল করে জানালেন তাদের মেয়ে পছন্দ হয়েছে তারা বেশি দেড়ি করতে চান না।আর প্রিয়ন্তির বাসায় সবাই রাজি।বিয়ের দিন ঠিক হলো ১৫ দিন পরে কারন ইফতির ট্রেনিং এ চলে যেতে হবে।২দিন পরে অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এলো প্রিয়ন্তির।রিসিভ করলো সে
-প্রিয়ন্তি বলছিলেন?
-জ্বী বলছিলাম।আপনি কে?
-আমি ইফতি।সকালে মা আন্টির কাছ থেকে আপনার নম্বরটা নিলো ভাবলাম একটু কল দেই।ব্যস্ত আপনি?
-না তেমন কিছু করছিলাম না।বাসার সবাই ভালো আছে?
-হুম আছে দুদিন পরে আমার বিয়ে তো।তাই সবাই একটু ব্যস্ত।
-(হেসে ফেলে বললো) তাই আপনার বিয়ে?
-জি আমার বিয়ে।আপানার সাথে কি বাহিরে দেখা করা যাবে?
-হুম কোথায় আসতে হবে বলুন?
-আসতে হবে না আপনি আপনার বাসার নিচে দাঁড়াবেন আমি আপনাকে পিক করবো।বিকালে রেডি থাকবেন।
বিকালে প্রিয়ন্তি রডি হয়ে বাসার নিচে গিয়ে দেখে ইফতি দাঁড়িয়ে আছে।মেরুন কালারের শার্টে বেশ লাগছিলো তাকে।কাছে যেতেই একগাদা গোলাপ তার হাতে দিয়ে বললো
-এগুলো আপনার জন্য।
সে ফুলগুলো হাতে নিলো।ইফতির সাথে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগছিলো তার।রসিক ধরণের মানুষ।একটু বেশি কথা বলে ভালোই লাগে স্বভাবটা।দেখতে দেখতে বিয়ের দিন চলে এলো।ধুমধাম করে বিয়েও হলো।১ মাস পরে ইফতি চলে যায় ট্রেনিং এর জন্য চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট এ।প্রিয়ন্তিও তার ফাইনাল পরীক্ষাটা বাবার বাসা থেকেই দেবে বলে চলে এলো। কিন্তু লাভ হলো কই?পড়ায় কোন ভাবেই মনযোগ নেই তার ওদিকে ইফতিও খুব ব্যস্ত দিনে এক ঘণ্টাও কথা হয় না। কিছুই ভালো লাগে না তার।সময়গুলো কাটতেই চায় না।
ইফতির ও মনে পড়ে প্রিয়ন্তির কথা কিন্তু তার কিছুই করার নেই তবে সামনে ওর জন্মদিন।অন্তত্য জন্মদিনটাতে তাকে একটা সারপ্রাইজ দেয়াই যায়।অনেক কষ্টে ২ দিনের ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ইফতি।একটা শাড়িও কিনে নিলো।রাতের বাসে উঠলো কিন্তু শেষ পর্যন্ত পৌঁছালো না ইফতি প্রিয়ন্তির কাছে।বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য এক্সিডেন্ট করে বাসটি।ইফতি মারা যায়।হতবাক প্রিয়ন্তি দেখছে তার লাশ।ছেড়ে চলে গেলো মানুষটা?কি নিয়ে বাঁচবে সে এখন?
তারপর কেটে গেলো ৭টা বছর।প্রতি বছর সে কবর জিয়ারত করতে যায়।ভুলে যায় নি ইফতিকে।নতুন করে ভাবে নি কিছু।
-কবর কি?
-মানুষ মারা গেলে কবর দিতে হয় মা।
-এটা কার কবর?
-তোমার বাবার।
-আমার বাবা মারা গেছে?
৬ বছরের ফুটফুটে বাচ্চাটার প্রশ্নের উত্তর দিলো না সে শুধু চোখ থেকে পানি পড়লো।আফসোস হয় ইফতিকে একটা বার জানাতে পারেনি তার কথা!!!




