"নিষ্পেশিত মানবতা"
আরিফুল ইসলাম মুকিম
রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে মানুষ কত্তোকিছু দেখে আর শেখে! কোনোটা অবাক করে। কোনোটা হাসায়, কোনটা কাঁদায় আবার কোনটা চিরদিনের জন্য স্থায়ী হয়ে যায় মনোস্পটে। সবার মতো আমারও আছে অনেক অভিজ্ঞতা আর অজস্র স্মৃতিতবে আজ শুধু একটাই বলবো বাকিগুলো অন্য কোথাও, অন্য কোন সময়।
১. মফস্বলেই থাকি বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঢাকাতে যাওয়াই হয়না। ক্লাসমেটদের প্রায় সবাই ঢাকায় থাকে। এজন্য কোন উপলক্ষ আসলেই ছুটে যাই সেখানে। প্রিয়জনদের সাথে হেসে-খেলে দু চারদিন কাটিয়ে আবার ফিরে আসি আপন নীড়ে, নিজের শহরে। এবার পরীক্ষার ছুটিটা হয়েছে ঠিক ফেব্রুয়ারির শুরুতে। এ মাসকে নতুন করে পরিচয় করানোর প্রয়োজন তেমন নেই। ভাষার মাস এটি। মুসলমান যুবকেরা নিজের জীবন দিয়ে ভাষার প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করেছে। বাংলা একাডেমী এসময় আয়োজন করে "একুশে বই মেলা"র যা প্রতিটি সাহিত্যপ্রেমীককে আন্দোলিত করে। আমিও আন্দোলিত হই। হারাতে চাই ভাষার মুগ্ধতায়। এমন সুযোগ আগে আর মেলেনি। যদিও বই মেলায় আরো গিয়েছি তবে লুকিয়ে। পরিবার আর মাদ্রাসা ফাঁকি দিয়ে!এবার সুযোগটা আর হাতছাড়া করতে চাইনি। তাই নিজে অনুনয় করে, বন্ধুদের দিয়ে সুপারিশ করিয়ে বহুকষ্টে বাবার থেকে ঢাকা যাওয়ার অনুমোদন পাশ করিয়েছি।
২.শীতের সকাল। ভর দুপুর ছাড়া রোদের দেখা পাওয়া মানে আমাবশ্যার চাঁদ হাতে পাওয়া। তাই রোদ উঠার অপেক্ষায় না থেকে সকাল সকাল বের হয়েছি। এখানকার দোকানিদেরকে প্রাচীনকালের নবাবজাদা বললে বোধয় বাড়াবাড়ি হবে না। ঘুমুবে সেই রাতে আর উঠবে দুপুর হয় হয় সময়। একটা দোকানও খোলা নেই। কিছু যে কিনবো তারও জো নেই। শহরটাও ফাঁকাফাঁকা লাগছে। তা লাগুক আমার সমস্যা নেই আমি যেতে পারলেই হলো। অন্য কোন ভাবনা না করে ঢাকাগামী বাসের টিকিট কিনে সিটে চেপে বসি। কিন্তু পেট তো মানছে না! বারবার সিগনাল দিচ্ছে। খোজ নিয়ে জানলাম চব্বিশঘণ্টা সার্ভিস দেয় এমন একটা রেস্টুরেন্ট চালু হয়েছে। টার্মিনাল চত্তরেই। ঘড়ি দেখলাম। বাস ছাড়ার এখনো পনের মিনিট বাকি। বেরিয়ে পরলাম। ররেস্টুরেন্টের ঠিক গেইটের সাথেই একটা........ বয়সটা বলতে পাচ্ছিনা তবে শীতের এই প্রকোপের মাঝেও সাতসকালে ছেড়া কাপড়াবৃত দেখে এটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারলাম যে, উনি পথ আশ্রিতদেরই একজন। রেখাবহুল মুখখানা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। দেখে বুঝা যায় এ জনমে বুজি সুখের দেখা পায়নি। মনে মনে খুব দয়া হলো। তার খাবারের বাজেটও করে ফেললাম। আজ আমার যেই নাস্তা হবে তাকেও সেটাই খাওয়াবো। কিন্ত তা আর হলো না। সম্ভবত ওয়েটারই হবে। সে এসে ছোট পেকেটে করে তার হাতে কিছু দিয়ে গেলো। সম্ভবত বার্গার বা রুল হবে, পিজ্জাও হতে পারে। মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে গেলো। ভাবলাম এখনো এমন কিছু ভালো মানুষ আছে যারা বঞ্চিতদের মনের আকুতি বুঝে। নিপীড়িতদের অশ্রুর ভাষা বুঝে। এজন্যই তো পৃথিবীটা আজো বড় সুন্দরভাবে চলছে।
৩. খুব দ্রুত কিছু খেয়ে আর কিছু পার্সেল নিয়ে বের হয়েই তো চোখ কপালে! সেই বৃদ্ধ বমি করছে! আর ওয়েটারের দেয়া জিনিসগুলি এদিক ওদিক ছুড়ে মারছে। বুঝা না যাওয়া ভাষায় বকাবকি করছে। এখন আর সেই ওয়েটারের মহানুভবতা(?) বুঝার বাকি রইল না। অগত্যা আমার যা কিছু পার্সেল নিয়ে ছিলাম সব উনার থলেতে ঢেলে দিয়ে আসলাম। পুরো পথে আর স্বস্তি পাইনি।চোখের জল হয়ত গড়ায়নি ভিতরে রক্তক্ষরণ হয়েছে ঠিকই। মানবতার এমন বিপর্যয় আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। ধিক এসেছে বারবার এই মানুষরূপী বানরের প্রতি যে বঞ্চিত মানবতাকে উপহাস করেছে উচ্ছিষ্ট অখাদ্য দিয়ে আর তাদের প্রতি যারা প্রতিনিয়ত উপহাস করে চলছে বঞ্চিত মানুষগুলোর সাথে।
প্রকাশিত
চিরকুট পত্রিকা
সূচনা সংখ্যা "মে" ২০১৮ ইং

No comments:
Post a Comment