Sunday, March 31, 2019

গল্প


অপেক্ষা

আজ সুবহার ১৫তম জন্মদিন।সকাল থেকেই আশ্রমের সবাই এটা নিয়ে হই হুল্লোড় করছে। মনি মা এর কড়া হুকুম সন্ধ্যের মদ্ধ্যে পুরো আশ্রমটা সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতে হবে। আশ্রমের ছোট বড় সবাই ফুল দিয়ে আশ্রমটা সাজাতে ব্যস্ত। সুবহা নিজের ঘরে বসে আছে। ওর ঘরটা দোতলায়।নিচে সবাই ব্যস্ত।সুবহা আপন মনে বসে ভাবছে। দেখতে দেখতে পুরো দশ বছর আশ্রমেই কাটিয়ে ফেলল সে।আজো ঝাপসা ঝাপসা মনে পড়ে তার সেদিন এর কথা। সে পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ে ছিলো তখন। তাদের প্রতিবেশী রুমা আন্টি তাকে এই আশ্রমে নিয়ে আসে। রুমা আন্টি না থাকলে তার কি যে হতো ভেবেই কান্না পায় তার। আজ মা বাবার কথাও তার খুব মনে পড়ছে। সুবহা তাদের খুব আদরের ছিলো। সুবহা উচ্চ বংশের মেয়ে ছিলো। বাবা কাকাদের নিয়ে একান্নবর্তী পরিবার ছিলো তাদের।সুবহার পাঁচ তম জন্মদিনে তার বাবা অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। তার বাবার মৃত্যু সংবাদ শোনা মাত্র তার মা ও হার্ট অ্যার্টাক করে সেদিনই মারা যান। সুবহা তখন মৃত্যু কি বুঝত না। শুধু বুঝতে পারল কিছু একটা খারাপ হয়েছে। পরদিন সকাল থেকে সে তার বাবা মা কে খুঁজতে থাকে। কিন্তু সারা বাড়িতে খুঁজেও বাবা মাকে পায়নি সে। খুব কষ্ট হয়েছিল তার। তার কাকি মনি তাকে একদম সহ্য করতে পারত না।পরদিন যখন সে বাবা মাকে খুঁজে আনার জন্য বায়না করেছিলো, তখন তার কাকি মনির কথায় তার কাকু মনি তাকে টেনে বাড়ির বাইরে বের করে মুখের উপর দরজা দিয়ে দিয়েছিলো। ছোট্ট সুবহা বাইরে বসে কান্না করছিলো। পাশের বাড়ির রুমা আন্টি তাকে দেখতে পেয়ে সাথে করে তার বাসায় নিয়ে গিয়েছিলো। রুমা আন্টি সুবহার কাকি মনির সাথে কথা বলেছিলো সুবহার ব্যাপারে। কিন্তু সুবহার কাকি মনি ওকে বাড়িতে নিয়ে যেতে রাজী হয়নি। এরপর রুমা আন্টি সুবহার নানা বাড়ির লোকজনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। তার দুই দিন পরই রুমা আন্টি তাকে এই আশ্রমে রেখে যায়। রুমা আন্টি প্রায় তার সাথে দেখাও করতে আসে।
এখন এই আশ্রমটাই সুবহার সব। আর তার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ তার মনি মা। যাকে ছাড়া সুবহার জীবন অর্থহীন। মনি মাকে সে তার নিজের জীবনের চাইতেও বেশি ভালোবাসে। এই একজন মানুষের জন্যই সুবহার জীবনটা এত রঙিন লাগে।
মনি মা এই দোতলা অনাথ আশ্রমটির কর্ণধার। ২০ বছর ধরে উনি এই অনাথ আশ্রমটা চালাচ্ছেন। পুরো আশ্রমের সবাই জানে যে মনি মা সুবহাকে নিজের মেয়ের মতই ভালোবাসে। আর সুবহার কাছে মনি মা ই যেনো নিজের প্রাণ। 
-- সুবহা।
সুবহা নিজের নাম তা শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখল মনি মা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।মনি মাকে দেখেই সুবহা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।মনি মা বলল..
-- এই যে মেয়ে, একা একা ঘরে বসে কি হচ্ছে শুনি। বাইরে যেতে পারিস না নাকি? সবাই বাইরে কত মজা করছে, আর তুই ঘরে বসে আছিস।
--উহহ মনি মা, তুমি কোথায় ছিলে এতক্ষণ? একবারও তো আসলে না আমায় ডাকতে?
--আজ তো আমার মেয়ের জন্মদিন। আমার যে অনেক কাজ ছিল রে। আচ্ছা সুবহা, এইবার ঝটপট বল তো, তোর জন্মদিনে তুই কি গিফট চাস?
-- আমি যা চাইব সেটা দেবে তো মনি মা?
-- হুম, দেবো। আগে বল কি চাস?
সুবহা মনি মাকে ছেড়ে দিয়ে বলল..
-- তোমাকে চাই মনি মা। কখনো ছেড়ে যেও না আমায়, প্লিজ। তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে আমি ঠিক মরে যাব।
--এসব কি কথা বলছিল তুই? অনেক হয়েছে, এবার থাম। আমি কখনো তোকে ছেড়ে কোথাও যাব না, বুঝলি তুই? বোকা মেয়ে।
--হুম, মনে থাকে যেনো।(আবার মনি মাকে জড়িয়ে ধরল সে)
--হুম থাকবে।এবার তৈরি হয়ে নিচে আয়।আমি তোর জন্য পায়েস করেছি। তারাতারি চলে আসিস কিন্তু। আমি যাই এখন।
এই বলে মনি মা চলে গেলো। একটু পর সুবহা খুব সুন্দর করে সেজে গুজে নিচে নামলো। সুবহা চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলো। আশ্রমটা এত সুন্দর করে তার জন্য সাজানো হয়েছে ভেবে চোখে জল চলে এলো সুবহার। রুমা আন্টিও এসেছে।
সবার সব কাজ শেষ। সবাই সুবহা কে নিয়ে ব্যস্ত।টেবিলে কেক টাও সাজিয়ে রাখা আছে। সবাই খুব উৎফুল্ল হয়ে আছে কেক কাটার জন্য।
মনি মা বলল.. 
--কেকটা কাটার আগে আমি সুবহাকে পায়েসটা খাওয়াতে চাই।আমি রান্না ঘর থেকে পায়েস টা নিয়ে আসছি।
সবাই মনি মার কথায় সায় দিলো। মনি মা পায়েস আনতে রান্না ঘরে চলে গেলো, আর ঠিক তখনি লোডশেডিং হয়ে গেলো।পুরো আশ্রম অন্ধকারে ঢেকে গেলো। 
এমন সময় রান্না ঘর থেকে মনি মার করুন চিৎকার ভেসে এলো। সবাই শুনতে পেলো সেই আর্ত চিৎকার। সুবহা সাথে সাথে বলে উঠল..
-- কি হলো, মনি মা চিৎকার করল কেনো ??
ঠিক তখনি কারেন্ট চলে আসলো। সুবহা সহ আরও বাকি সবাই দৌড়ে গেলো রান্নাঘরে।সুবহা রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেলো, রান্নাঘরের মেঝেতে রক্ত আর রক্ত।মনি মা মেঝেতে পরে কাতরাচ্ছে।তার পেটে একটা আঁশবটি ঢুকে আছে। সুবহা মনি মা বলে জোরে একটা চিৎকার করে সাথে সাথেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল....।
দুই মিনিটের লোডশেডিং এ দুটি জীবনের আলো নিভে গেলো। তবে দুই জনের জীবনের আলোটা আলাদা আলাদা ভাবে নিভে গেলো। মনি মা চলে গেলো। আর সুবহার আলো ভরা জীবন অন্ধকারে রুপ নিলো। ৪ বছর পর।

মানসিক হাসপাতালের রুম নম্বর ৩২।।
-- সুবহা দেখো, তোমার জন্য আমি কি এনেছি। পায়েস। কি, খাবে না তুমি? এদিকে আসো তো আমি খাইয়ে দেই।
সুবহা মাথা তুলে বলল..
-- ওই ছায়া আপু, তুমি জানো না নাকি? আমার মনি মা আমার জন্য পায়েস আনতে রান্নাঘরে গেছে। এক্ষুনি এসে যাবে। একটু দাঁড়াও না, মনি মা আসবে।
ছায়া এই মানসিক হাসপাতালে ২০ বছর ধরে কাজ করছে। বিগত চার বছর ধরে সে সুবহার দেখাশোনা করছে।মনি মার মৃত্যুর পর থেকেই সুবহা মানসিক ভাবে অসুস্থ।মাঝে মাঝে সুবহার রুমা আন্টি এসে ওকে দেখে যায়। এই চার বছরে ছায়া যখনি সুবহা কে পায়েস খাওয়াতে গিয়েছে, তখনি সুবহা এই একি কথা বলেছে। জোর করলে পায়েস এর বাটি ফেলে দিয়েছে, নয়ত জিনিস পত্র ভাঙচুর করেছে। তাই ছায়া আর বৃথা চেষ্টা করল না। ছায়া জানে, সুবহাকে বুঝিয়ে কোনো লাভ হবে না। সে যে এখন ও তার মনি মার জন্য অপেক্ষা করছে। আর আগামী তেও করবে।
আচ্ছা, এই অপেক্ষা কি কখনো শেষ হবে??

No comments:

Post a Comment

কোন এক বিকেল

মাঝে মাঝে রৌদ্রুহীন এই বৃষ্টির বিকেলে হারিয়ে যাই নিরবতার মাঝে, অসহায় হয়ে যাই একাকিত্বের ক্লান্তিতে হতাশার চাদর জড়িয়ে ধরে আমাকে।  বিকেলের...